নানা প্রতিকূলতা সত্ত্বেও নিজ নিজ কর্মক্ষেত্রে বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখছেন বাংলাদেশের নারীরা। নিজেদের কর্মদক্ষতা ও প্রচেষ্টা দিয়ে তারা যেমন তাদের কর্মক্ষেত্রে ঘটাচ্ছেন বিপ্লব, ঠিক তেমনভাবেই স্থাপন করছেন অনুপ্রেরণার নতুন এক দৃষ্টান্ত। দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি দেশের নারীসমাজের উন্নয়নেও রাখছেন অপরিসীম অবদান। তাদের সাফল্য তারার মতোই পথ দেখাচ্ছে বাংলাদেশের লাখো নারীদেরকে, নিয়ে যাচ্ছে নতুন সম্ভাবনার পথে। আসুন শুনি সেইরকম কিছু তারাদের গল্প।
শারমিন আক্তারঃ

শুধু দেশে নয়, আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও শারমিন আক্তার এখন খুব পরিচিত একটি নাম। তার সাহসিকতা, অন্যায়ের বিরুদ্ধে তার প্রতিবাদই তাকে এনে দিয়েছে আন্তর্জাতিক পরিচিতি। বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধে বলিষ্ঠ কণ্ঠের একজন সৈনিক শারমিন আক্তার। তার শুরুটা হয়েছিলো নিজের বাল্যবিবাহ ঠেকিয়ে দিয়েই। ২০১৫ সালে শারমিন যখন মাত্র নবম শ্রেণির ছাত্রী, তখন তার মা প্রতিবেশী এক যুবকের সঙ্গে তার বিয়ে ঠিক করেন। এতে শারমিন রাজি না হলে তাকে মারধর করা হয়। এমনকি যে যুবকের সঙ্গে শারমিনের বিয়ে ঠিক হয়, তাঁর সঙ্গে শারমিনকে এক ঘরে আটকে রাখেন তার মা। পরে বাড়ি থেকে পালিয়ে এক সহপাঠীর সহযোগিতায় শারমিন থানায় গিয়ে তার মা ও ওই যুবকের বিরুদ্ধে মামলা করে। একজন গ্রামের মেয়ে হয়ে শারমিন যে সাহস দেখিয়েছিলেন, তা অতুলনীয়। এই সাহসিকতার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ‘ইন্টারন্যাশনাল উইমেন অব কারেজ (আইডব্লিউসি) ২০১৭’ পুরস্কার পেয়েছে শারমিন। মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ২০০৭ সাল থেকে সাহসিকতার জন্য নারীদের এই পুরস্কার দিয়ে আসছে। মায়ের বিরুদ্ধে করা তার মামলাটি এখনো চলছে। পাশাপাশি তিনি চালিয়ে যাচ্ছেন পড়াশুনা। ভবিষ্যতে বাল্যবিবাহের কুফল সম্পর্কে গ্রামবাংলার নারীসমাজকে সচেতন করতে চান তিনি। তার সাহসিকতায় অনুপ্রাণিত হয়ে বাল্যবিবাহ রোধে নিজ নিজ জায়গা থেকে এগিয়ে আসুক বাংলাদেশের নারীরা, এই আমাদের প্রত্যাশা।
নুরুন নাহারঃ

নুরুন নাহার একাধারে একজন শিক্ষাবিদ, গবেষক, নারী আন্দোলনের নেত্রী এবং সমাজকর্মী। তিনি ১৯৩২ সালের ২১শে মে নদীয়া জেলার চাকদা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর পাশ করেন। পরবর্তীতে তিনি ১৯৬৬ সালে কলোরাডো স্টেট ইউনিভার্সিটি থেকে শিক্ষাবিদ হিসেবে ডক্টরেট লাভ করেন। শিশুকাল থেকেই তিনি খেলাধুলা এবং সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে পরিবারের সমর্থন ও সহায়তা পেয়েছিলেন। কর্মজীবনে তিনি শিক্ষকতার পাশাপাশি আরো অনেক কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিলেন। তিনি ১৯৭৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেটের সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হন। তিনিই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেটের প্রথম নির্বাচিত নারী সদস্য। এছাড়াও তিনি বাংলাদেশ পাবলিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের বোর্ড অফ গভর্নরস-এ এবং বাংলাদেশের ওয়েজ কমিশনে সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বেগম রোকেয়া হলের প্রভোস্ট হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। নারী উন্নয়নে তার অবদান বহুবিধ। নারী গবেষণা প্রতিষ্ঠান “উইমেন ফর উইমেন”-এর শুরু থেকেই তিনি সংগঠনটির সাথে ছিলেন। এছাড়াও তিনি আজিমপুর লেডিস ক্লাব প্রতিষ্ঠা করেন যা পরবর্তীতে প্রতিষ্ঠা করে অগ্রণী স্কুল। এছাড়াও তিনি বেগম রোকেয়া ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘উইমেন স্টাডিজ’ ডিপার্টমেন্টটি খোলার পিছনেও তার অবদান ছিলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তার বর্ণাঢ্য কর্মময় জীবন আজকের নারীদের জন্য প্রেরণা হয়ে থাকবে সবসময়। বহুমুখী প্রতিভাকে বিকশিত করে কিভাবে দেশ এবং সর্বোপরি জাতিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যায় তারই এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবেন নুরুন নাহার।
রুবানা হকঃ

নানা প্রতিভার অধিকারী রুবানা হক বাংলাদেশের একজন নারী ব্যবসায়ী এবং কবি। শিক্ষকতা দিয়ে তিনি তার কর্মজীবন শুরু করেন। পরবর্তীতে স্বামী আনিসুল হককে সাহায্য করতেই যুক্ত হন তার ব্যবসায়। ব্যবসায়িক বিষয়ে তার সিদ্ধান্ত গ্রহণের দ্রুততা ও দক্ষতা তাকে পরিণত করে একজন বিচক্ষণ ব্যবসায়ীতে। ব্যবসা চালানোর পাশাপাশি তিনি চালিয়ে যান সাহিত্যচর্চা ও পিএইচডি-র পড়াশুনা। ব্যবসা চালাতে চালাতেই ভারতের যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে “রাইটারস ওয়ার্কশপঃ এজেন্ট অব চেঞ্জ” বিষয়ে লাভ করেন পিএইচডি ডিগ্রি। বর্তমানে ২১টি প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তিনি। এছাড়াও দায়িত্ব পালন করেছেন বিজিএমইএ-র প্রথম নারী সভাপতি হিসেবে। এর পাশাপাশি কাব্যচর্চাও কিন্তু থেমে থাকেনি। কবিতা লিখে তিনি পেয়েছেন সার্ক সাহিত্য পুরস্কার। নানা দিকে নিজের প্রতিভার বিকাশ ঘটিয়ে প্রগতিশীল নারীদের মধ্যে নিজেকে এক অনন্য নিদর্শন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন তিনি। তার উদাহরণ থেকে অনুপ্রেরণা নিয়ে এগিয়ে যাক বাংলাদেশের নারীরা, এই আমাদের প্রত্যাশা।
আরদিনা ফেরদৌস আঁখিঃ

শ্যুটিংয়ে অ্যাথলেট হিসেবে নারীদের অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে আশা দেখিয়ে যাচ্ছেন আরদিনা ফেরদৌস আঁখি। এসএ গেমসে মেয়েদের একক এয়ার পিস্তলে রুপা জিতে অনন্য কীর্তি গড়েছেন আরদিনা ফেরদৌস আঁখি। প্রতিযোগিতার ইতিহাসে এই ইভেন্টে বাংলাদেশের প্রথম নারী হিসেবে পদক জিতেছেন আরদিনা। এর আগের আসরে তার পিস্তলে গোলযোগ দেখা দেওয়ায় তিনি ঠিকমতো পারফর্ম করতে পারেননি। তারপর থেকেই তিনি চেষ্টা করে গেছেন শ্যুটিংয়ে বাংলাদেশকে পদক এনে দেওয়ার, নিয়েছেন কঠোর প্রস্তুতি। তারপরেই আসে সাফল্য। শ্যুটিংয়ে সাধারণত মেয়েদের অংশগ্রহণের আগ্রহ কম থাকে। কিন্তু আরদিনার এই অর্জন এক অনন্য সম্ভাবনার গল্প হয়ে উৎসাহ যুগিয়ে যাবে বাংলাদেশের আগামীর নারী অ্যাথলেটদের। তার সাফল্যের গল্প তৈরি করবে আরো হাজারো সাফল্যের গল্প, এই আমাদের প্রত্যাশা।
সব ক্ষেত্রেই নারীদের জন্য রয়েছে অপার সম্ভাবনা। এই সম্ভাবনাকে বাস্তব করতে হলে চাই সাহস ও প্রচেষ্টা। এই সফল নারীদের দৃষ্টান্ত থেকে সাহস নিয়ে আগামীর পথে নিজেদের সম্ভাবনা বাস্তবায়নে এগিয়ে যাবে বাংলাদেশের নারীরা, এটাই আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস।
বিশ্বমঞ্চে কূটনৈতিক দক্ষতা ও মানবাধিকার বিষয়ে সক্রিয় ভূমিকার জন্য ইতিমধ্যেই প্রসিদ্ধ বাংলাদেশের কূটনীতিক রাবাব ফাতিমা। তিনি ১৯৮৬ সালে বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে পররাষ্ট্র ক্যাডার হিসেবে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে যোগদান করেন। পরবর্তীতে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের টাফ্‌টস ইউনিভার্সিটির ফ্লেচার স্কুল অব ল অ্যান্ড ডিপ্লোমেসি থেকে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও কূটনীতি বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।

কর্মজীবনে রাবাব ফাতিমা মানবাধিকার ও মানবিক ইস্যুতে কাজ করেছেন। ২০০৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০০৭ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তিনি কমনওয়েলথ সচিবালয় ও আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার মানবাধিকার বিষয়ক বিভাগের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক প্রতিনিধি হিসেবে ঢাকায় ও দক্ষিণ-পশ্চিম এশিয়ার আঞ্চলিক সমন্বয়কারী ও পরামর্শক হিসেবে ব্যাংককে দায়িত্ব পালন করেছেন।

পরবর্তীতে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্কের বাংলাদেশের স্থায়ী মিশন, কলকাতা, জেনেভা ও বেইজিং-এর বাংলাদেশ মিশনে বিভিন্ন পদে কর্মরত ছিলেন। ২০১৫ সালের নভেম্বরে তাকে জাপানের রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব প্রদান করা হয়। এরপূর্বে তিনি বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পূর্ব এশিয়া ও প্যাসেফিক বিষয়ক মহাপরিচালকের দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৯ সালের ৫ ডিসেম্বর তিনি জাতিসংঘে নিযুক্ত বাংলাদেশের ১৪তম স্থায়ী প্রতিনিধি হিসেবে যোগদান করেন।

বিশ্বব্যাপী শিশুরা যেসব ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে তা মোকাবিলাসহ ২০২০ সালকে ইউনিসেফের জন্য একটি অর্থবহ ও কার্যকর বছরে পরিণত করতে বোর্ড সদস্যরা সর্বসম্মতিক্রমে তাকে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত করেন। শিশুদের কল্যাণ সাধন, উন্নয়ন ও অধিকার সুরক্ষার জন্য এই নির্বাহী বোর্ড নতুন নতুন ধারণা ও কৌশল সৃজনে নিবেদিতভাবে কাজ করবে।

এভাবেই রাবাব ফাতিমার হাত ধরে বিশ্বমঞ্চে কূটনীতিতে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। রাবাব ফাতিমা প্রেসিডেন্ট হওয়ার ফলে এখন থেকে বাংলাদেশ শিশুদের জন্য বিশেষভাবে নিয়োজিত জাতিসংঘ সংস্থা ইউনিসেফের কর্মকাণ্ডে কৌশলগত দিক-নির্দেশনাও প্রদান করতে পারবে।

অভিনন্দন রাবাব ফাতিমা। আপনার প্রতি রইলো অশেষ শুভকামনা। আপনার পদাঙ্ক অনুসরণ করে এগিয়ে যাক হাজারো নারী এই আমাদের প্রত্যাশা।
সংগ্রাম এবং সাফল্য মিলে তৈরি একটি নাম জয়া চাকমা। তার জন্ম রাঙামাটি জেলায়। ২০০২ সালে তিনি রাঙ্গামাটি সরকারি বালিকা বিদ্যালয়ে ভর্তি হন। মূলত এখান থেকেই ফুটবলের সাথে তার পথচলা শুরু। ২০০৫ সালে বাংলাদেশ মহিলা ক্রীড়া সংস্থার আয়োজনে ঢাকায় আন্তঃজেলা ফুটবল টুর্নামেন্টে নিজ জেলা রাঙ্গামাটি অপরাজিত হয়। অসাধারণ নৈপুণ্য প্রদর্শন করে সবার নজর কাড়েন তিনি। জয়া চাকমা টানা চার বছর বয়সভিত্তিক ফুটবলের পাশাপাশি জাতীয় দলেও খেলেছেন। এরই সাথে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইতিহাসে করেছেন মাস্টার্স। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় ২০১০ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের হ্যান্ডবল দলের অধিনায়কের দায়িত্ব পালন করেন। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় প্রতি বছর তিনি দ্রুততম মানবী হন।
জাতীয় দলে থাকতেই ২০১০ সালে বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের রেফারিংয়ের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। ২০১২ সালে জাতীয় দল থেকে বাদ পড়লে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শারীরিক শিক্ষা বিভাগের প্রশিক্ষক সাদাত হোসেনের পরামর্শে রেফারিংয়ে মনোনিবেশ করেন। ২০১২ সালে বঙ্গমাতা ফুটবল টুর্নামেন্ট দিয়ে নিয়মিত রেফারিং শুরু করেন।
শীঘ্রই বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম নারী রেফারি হিসেবে আন্তর্জাতিক ফুটবল ফেডারেশন ফিফায় যোগদান করছেন জয়া চাকমা। এর আগে বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম নারী হিসাবে আন্তর্জাতিক ফুটবল ম্যাচ পরিচালনা করেন তিনি।
প্রবল ইচ্ছাশক্তির বলে আজ জয়া চাকমা বাংলাদেশের ফুটবলের একজন আদর্শ। তাঁর এই অর্জনের ছায়ায় বেড়ে উঠুক আমাদের দেশের লাখো তরুণীর এগিয়ে যাবার গল্প।

জয়া চাকমার ব্যাপারে আরও বিস্তারিত জানতেঃ https://www.newagebd.net/article/82559/meet-bangladeshs-first-female-referee-joya